করোনা মোকাবেলায় হোমিওপ্যাথিক কতটা কার্যকর?

হোমিওপ্যাথি হলো একটি লক্ষণভিত্তিক প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতি। ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান এই চিকিৎসা পদ্ধতির প্রবর্তক। তিনি ১৭৯৬ খ্রিস্টাব্দে এই চিকিৎসা পদ্ধতির প্রবর্তন করেন এবং ১৮০৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে তিনি সফলতার সঙ্গে

এই চিকিৎসাকার্য পরিচালনা করেন।যেহেতু হোমিওপ্যাথি একটি লক্ষণভিত্তক চিকিৎসা পদ্ধতি, তাই রো’গীর রোগ লক্ষণ অনুযায়ী সদৃশ হোমিওপ্যাথিক ওষু’ধ প্রয়োগের মাধ্যমে যেকোন রো’গ আরো’গ্য করা সম্ভব।

বর্তমান সময়ে সবচেয়ে মহাসংকটের নাম কোভিড ১৯ বা করো’নাভাইরাস, যা বিশ্বমহামা’রীর আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর প্রায় সকল দেশই এ ভাইরাসে আক্রান্ত।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনার মেডিসিন ও ভ্যাক্সিন নিয়ে কাজ ও গবেষণা শুরু হলেও এখন পর্যন্ত কার্যত সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার হয়নি। পৃথিবীর কোন চিকিৎসা পদ্ধতিই এ চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সাফল্য বয়ে আনতে পারেনি।

এমতাবস্থায় আশার আলো দেখাচ্ছে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতি। ইতোমধ্যে ইতালি, স্পেন, কিউবা ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে হোমিও চিকিৎসার মাধ্যমে অতি দ্রুততার সঙ্গে বহু করো’না রো’গী সম্পূর্ণরূপে আরোগ্য লাভ করেছেন।

বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথিক ওষু’ধ প্রয়োগ করে এমনি একটি আশানুরূপ নজির স্থাপিত হয়েছে পুরান ঢাকার স্বামীবাগে অবস্থিত ইসকন মন্দিরে। মাত্র ৭ দিনের হোমিও ওষু’ধ প্রয়োগ করে সুস্থ হয়েছেন ইসকন মন্দিরের পুরোহিতসহ ৩৫ জন করো’না রো’গী।

এমন খবর প্রকাশ হওয়ার পর বাংলাদেশ টেলিভিশন, জি-টিভি, মাই টিভিসহ অনেক টেলিভিশন এ বিষয়ে একাধিক সংবাদ প্রকাশ করেছে।এ মন্দিরের করো’না রো’গীদের সুস্থ হওয়ার পেছনে হোমিওপ্যাথির সাফল্যটি যদি আমরা পরীক্ষামূলক হিসেবেও গ্রহণ করি, তাহলে পরবর্তীতে দেখা যায় ঢাকার রাজারবাগ সেন্ট্রাল পু’লিশ হসপিটালের করোনা ওয়ার্ডের ৪২ জন রোগী শুধুমাত্র হোমিওপ্যাথিক ও’ষুধ সেবনের মাধ্যমে পুরোপুরি আরোগ্য লাভ করেছেন মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই। যা সম্পূর্ণ কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি রূপেই প্রতীয়মান হয়েছে।

এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে করো’নার লক্ষণ উপসর্গ নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই স্বল্প খরচে হোমিও ও’ধ সেবনের মাধ্যমে পুরোপুরি আরোগ্য লাভ করেছেন। করো’না সং’ক্রমণের ফলে রো’গীর যেসকল লক্ষণ উপসর্গ ও নিদানিক বৈকল্য দেখা দেয় তার প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু লাক্ষণিক হোমিও চিকিৎসাই যথেষ্ট হয়।

বাংলাদেশের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকগণ ইতোমধ্যেই সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। ফল স্বরূপ আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা বিশেষ করে পুলিশ বিভাগ হোমিও সেবা গ্রহণ করছেন এবং সুস্থও হচ্ছেন।

করোনা সংক্রমণের শুধুমাত্র প্রাথমিক পর্যায়েই নয় বরং একেবারে চরম পর্যায়ে রো’গীর জীবন সংক’টাপন্ন অবস্থায়ও হোমিও চিকিৎসার সক্ষমতা রয়েছে। যেহেতু করোনা সং’ক্রমণের কোন পর্যায়ের চিকিৎসাই প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থায় কোন সুনির্দিষ্ট ওষু’ধ বা চিকিৎসা নির্ণায়িত হয়নি, এমতাবস্থায় এসব রো’গীর চি’কিৎসায় লক্ষণ ভিত্তিক হোমিও ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে রো’গীর জীবন রক্ষা করার পাশাপাশি রোগীর স্বাস্থ্য পুনর্বাসনে সহায়তা করা যেতে পারে।

করো’না মো’কাবেলায় হোমিও চিকিৎসকগণ লক্ষণ সদৃশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন- 1. Arsenicum Album    2. Bryonia  3 .Belladonna   4. Aconite Nap.   5. Kali Bichromicum    6. Gelsemium প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

যুগে যুগে মহামা’রিতে হোমিও চিকিৎসার সাফল্যগাঁথা রয়েছে বিশ্বময়। ১৭৯৯ সালে জার্মানিতে স্কারলেট ফিভার মহামারিতে হোমিও চিকিৎসা করে ড. হ্যানিম্যান সফলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ১৮১৩ সালে টাইফাস ফিভার মহামা’রিতে হোমিও চিকিৎসায় মৃ’ত্যুর হার ছিল ১.১১ শতাংশ, যেখানে অন্যান্য চিকিৎসায় রো’গীর মৃ’ত্যুর হার ছিল ৩০ শতাংশ।

এছাড়া ১৮৩১ সালে অস্ট্রিয়ার কলেরা মহামা’রি, ১৮৪৯ সালে সিনসিনাটির কলেরা মহামা’রি, ১৮৫৪ সালের লন্ডনের কলেরা মহামারি, ১৮৬২-১৮৬৪ পর্যন্ত নিউইয়র্ক ডিপথেরিয়া, ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লু, ২০১৮-২০১৯ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গু ও চিকু’নগুনিয়াসহ আরও অনেক মহামা’রিতে হোমিও চিকিৎসার উল্লেখযোগ্য সফলতা রয়েছে।

এত এত সফলতার পরেও প্রচার প্রসার ও সুযোগ সুবিধা কম থাকার দরুন সেভাবে হোমিও চিকিৎসা সেবা পরিচালনা করা ব্যাপকভাবে সম্ভব হয় না বা হচ্ছেও না।মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যদি এ বিষয়ে সুদৃষ্টি জ্ঞাপন করেন তাহলে হোমিও চিকিৎসার মাধ্যমে এ করো’না পরিস্থিতি মো’কাবেলা করা সম্ভবপর হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ পূর্বক সুদৃঢ়চিত্তে বলতে চাই, যদি সেন্ট্রাল পু’লিশ হসপিটালের ন্যায় প্রতিটি হসপিটালে হোমিওপ্যাথিক করো’না ইউনিট চালু করা হয়, তাহলে এ সংক’টময় পরিস্থি’তি সফলতার সঙ্গে মোকাবেলা করা আরও অনেক সহজতর হবে।

নাঈমা সুলতানা, বিএইচএমএস, বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ এন্ড হসপিটাল, ঢাকা

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *